২০২৫ সালের চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার: মানবদেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে

 


 ২০২৫ সালের চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার: মানবদেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে 


সূচনা


প্রতিবছর নোবেল পুরস্কার ঘোষণার মুহূর্তটি বিজ্ঞান জগতের জন্য এক বিশাল উদ্দীপনার সময়।

২০২৫ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিনজন অসাধারণ বিজ্ঞানী —

মেরি ই. ব্রাংকো (Mary E. Brunkow),

ফ্রেড র‍্যামসডেল (Fred Ramsdell),

এবং শিমন সাকাগুচি (Shimon Sakaguchi)।


তাদের যুগান্তকারী আবিষ্কার মানুষের ইমিউন সিস্টেম, অর্থাৎ শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, নতুনভাবে বুঝতে সাহায্য করেছে।

তারা এমন কোষ আবিষ্কার করেছেন, যা শরীরকে নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আক্রমণ করা থেকে রক্ষা করে — যার নাম Regulatory T-cell বা সংক্ষেপে Treg।






 মেরি ই. ব্রাংকো: নীরব গবেষণার নায়িকা


জন্ম ও শিক্ষা:

মেরি ই. ব্রাংকো একজন মার্কিন বিজ্ঞানী। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন রাজ্যে জন্মগ্রহণ করেন।

তিনি জীববিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং ছোটবেলা থেকেই জীবজগতের রহস্য বোঝার প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি জেনেটিক্স ও মলিকিউলার বায়োলজিতে বিশেষভাবে মনোযোগ দেন।


কর্মজীবন:

তিনি মানব জিনের ভেতরে ইমিউন নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত জিনের কার্যকারিতা নিয়ে কাজ করেন।

তার নেতৃত্বে গবেষক দল Foxp3 নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ জিন শনাক্ত করে, যা মানুষের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে রাখে।


অবদান:

Foxp3 জিনটি মূলত শরীরের “Regulatory T-cell” গুলোকে সক্রিয় করে।

এই জিন না থাকলে শরীর নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে ভুলবশত শত্রু মনে করে আক্রমণ করে, ফলে সৃষ্টি হয় অটোইমিউন রোগ।

এই আবিষ্কারের মাধ্যমে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, কীভাবে শরীরের ইমিউন সিস্টেম ভারসাম্য রক্ষা করে এবং কখন সেটি বিঘ্নিত হয়।





 ফ্রেড র‍্যামসডেল: প্রতিরোধ ব্যবস্থার রহস্য উন্মোচক


জন্ম ও শিক্ষা:

ফ্রেড র‍্যামসডেল জন্মগ্রহণ করেন যুক্তরাষ্ট্রে। তিনি জীববিজ্ঞান ও ইমিউনোলজি বিষয়ে পড়াশোনা করেন।

তিনি ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি  থেকে  পিএইচডি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে  স্টানফোর্ড ইউনিভার্সিটি পোস্টডক্টরাল গবেষণা করেন।


কর্মজীবন:


তাঁর গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু ছিল – কীভাবে শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা "বন্ধ" বা "চালু" হয়, এবং কখন সেটি নিজের শরীরকে ভুলবশত আক্রমণ করে।


অবদান:

র‍্যামসডেল মেরি ব্রাংকোর সঙ্গে মিলে Foxp3 জিনের ভূমিকা নির্ধারণ করেন।

তারা একসাথে প্রমাণ করেন যে, যদি Foxp3 জিন কাজ না করে, তাহলে শরীরে মারাত্মক রোগ হয় – যেমন শিশুদের মধ্যে IPEX Syndrome, যা প্রাণঘাতী অটোইমিউন অসুখ।

তাদের এই গবেষণা দেখিয়েছে, Foxp3 হলো মানুষের ইমিউন ভারসাম্যের মূল চাবিকাঠি।





 শিমন সাকাগুচি: বিশ্বের বিজ্ঞানমহলে এক কিংবদন্তি


জন্ম ও শিক্ষা:

শিমন সাকাগুচি (Shimon Sakaguchi) জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫০ সালে জাপানের কিয়োটো শহরে।

তিনি কিয়োটো ইউনিভার্সিটি  থেকে স্নাতক ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ইমিউনোলজি বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন এবং বিশেষ করে শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থার ভারসাম্য নিয়ে গবেষণা করেন।


কর্মজীবন:


সাকাগুচি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন  ওসাকা ইউনিভার্সিটি এর  ইমিউন রেগুলেশন রিসার্চ ইনস্টিটিউটে।

তার গবেষণাগার থেকেই প্রথম “Regulatory T-cell” ধারণাটি উঠে আসে।

তিনি প্রথম দেখান, এই কোষগুলো শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং শরীরকে নিজেই নিজের ক্ষতি করা থেকে বাঁচায়।


অবদান:

সাকাগুচির গবেষণাই পরে মেরি ব্রাংকো ও ফ্রেড র‍্যামসডেলের জিন সংক্রান্ত আবিষ্কারের সঙ্গে মিলিয়ে যায়।

তিনি কোষের স্তরে যা আবিষ্কার করেছিলেন, ব্রাংকো ও র‍্যামসডেল সেটির জেনেটিক ব্যাখ্যা দেন।

তিনজন মিলে মানুষের ইমিউন ভারসাম্য বুঝতে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র উপহার দেন।





 তাদের গবেষণা আসলে কী পরিবর্তন এনেছে?


মানবদেহের ইমিউন সিস্টেম এমন এক জটিল ব্যবস্থা, যা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা ক্ষতিকর উপাদানের বিরুদ্ধে লড়াই করে।

কিন্তু অনেক সময় শরীর ভুল করে নিজের কোষগুলোকেই আক্রমণ করে — এটিই অটোইমিউন রোগ।

যেমন –


টাইপ–১ ডায়াবেটিস


রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস


লুপাস


মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস



Regulatory T-cell বা Treg কোষগুলোই এই ভুল প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে।

Foxp3 জিন এই কোষগুলোর “মাস্টার সুইচ” হিসেবে কাজ করে — যেন শরীর ঠিকমতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে কোনটি নিজের আর কোনটি শত্রু।





 চিকিৎসা বিজ্ঞানে তাদের আবিষ্কারের সুফল


 অটোইমিউন রোগের নতুন চিকিৎসা:

এই গবেষণার মাধ্যমে এমন ওষুধ তৈরি হচ্ছে যা শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।

এর ফলে টাইপ–১ ডায়াবেটিস, লুপাস, ও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসা অনেক উন্নত হবে।


 ক্যান্সারের বিরুদ্ধে নতুন দিকনির্দেশনা:

ক্যান্সার কোষগুলো অনেক সময় এই Regulatory T-cell কে ব্যবহার করে নিজেদের রক্ষা করে।

তাদের ভূমিকা বোঝার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এখন ক্যান্সারের চিকিৎসা আরও কার্যকর করার পথ খুঁজছেন।


 অঙ্গ প্রতিস্থাপন সহজতর:

Regulatory T-cell–এর ব্যবহার করে শরীরের “গ্রাফ্ট রিজেকশন” বা প্রতিস্থাপিত অঙ্গ প্রত্যাখ্যানের প্রবণতা কমানো যাবে।


 নতুন ওষুধ উদ্ভাবন:

Foxp3 ও Treg ভিত্তিক থেরাপি ভবিষ্যতের ওষুধ নির্মাণে নতুন অধ্যায় খুলবে।





 ভবিষ্যতে এই গবেষণার প্রভাব


তিন বিজ্ঞানীর এই আবিষ্কার শুধু চিকিৎসা বিজ্ঞানেই নয়, পুরো মানব সভ্যতার জন্য এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।

এটি আমাদের শিখিয়েছে —

মানবদেহ কতটা বুদ্ধিদীপ্তভাবে নিজের ভারসাম্য রক্ষা করে এবং সামান্য এক জিন বা কোষ কিভাবে পুরো শরীরের আচরণ পাল্টে দিতে পারে।


আগামী দশকে তাদের গবেষণা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আরও উন্নত ইমিউন থেরাপি, ক্যান্সার ইমিউনাইজেশন, এমনকি জিন-ভিত্তিক ওষুধ তৈরি হবে।

অর্থাৎ এই তিনজনের কাজ আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভিত্তিকে আরও শক্ত ও মানবিক করে তুলবে।





 নোবেল পুরস্কারের কারণ


নোবেল কমিটি বলেছে —


 “তাদের আবিষ্কার মানবদেহের ইমিউন সিস্টেমের ভারসাম্য বুঝতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে।

এই কাজ ভবিষ্যতে অটোইমিউন রোগ ও ক্যান্সারের চিকিৎসায় নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করবে।”




এই পুরস্কার তাদের বৈজ্ঞানিক দক্ষতা, নিষ্ঠা এবং মানবকল্যাণে অবদানের স্বীকৃতি।





 উপসংহার


মেরি ই. ব্রাংকো, ফ্রেড র‍্যামসডেল ও শিমন সাকাগুচি শুধু তিনজন বিজ্ঞানী নন, তারা ভবিষ্যতের চিকিৎসাবিজ্ঞানের তিনটি স্তম্ভ।

তাদের গবেষণা আমাদের শিখিয়েছে – বিজ্ঞান শুধু পরীক্ষাগারে নয়, মানবতার মঙ্গলেও কাজ করে।

তাদের অবদান দেখিয়েছে, ক্ষুদ্র এক কোষ কিংবা একটিমাত্র জিনও পারে কোটি মানুষের জীবন বদলে দিতে।






Comments

Popular posts from this blog

দ্বিতীয় পর্ব :প্রাথমিক পর্যায়ে চালু হওয়া দেশগুলোতে পি আর পদ্ধতির ধরন

প্রথম পর্ব: পি আর পদ্ধতির ইতিহাস ও গণতান্ত্রিক ধারায় এর প্রতিফলন

তৃতীয় পর্ব : পি আর পদ্ধতির সফলতার গল্প