২০২৫ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার । উদ্ভাবন, জ্ঞানের বিনিময় ও স্বাধীন চিন্তাই অর্থনীতি মন কালিকা শক্তি ।

 


 ভূমিকা: অর্থনীতির মৃত্যুর খেলা নয়, নতুন প্রাণের সন্ধান


ইতিহাস বলে — অধিকাংশ সময় অর্থনীতি ছিল স্থবির; কোনও দেশ বা সমাজ কেবল কিছু সময় বৃদ্ধির সুবাদে এগিয়ে যায়, তারপর গতি থেমে যায়। কিন্তু গত ২০০ বছরের ইতিহাস এক নতুন ধারা দেখিয়েছে — এক অবিরাম প্রবৃদ্ধির যুগ, যেখানে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন চোখের সামনে অর্থনীতিকে পুনর্নবীকরণ করে।

২০২৫ সালের নোবেল কমিটি তাদের পুরস্কার দিয়েছে তাদের জন্য যারা আমাদের এই গোপন গতি ও সেই পরিবর্তনের মেকানিজমগুলো ব্যাখ্যা করেছেন — অর্থাৎ, “কেমনভাবে প্রযুক্তি ও নতুনত্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চালায়”। 




 জোয়েল মকির 










পরিচিতি


জন্ম: 

২৬ জুলাই ১৯৪৬, লেইতেন, নেবেল্যান্ডস 


তিনি পরবর্তীতে পরিবারের সঙ্গে ইস্রায়েলে বসবাস করেন এবং ওই দেশ ও যুক্তরাষ্ট্র—দুটি দেশে মেধা জোগান করেছেন 


শিক্ষা:

 • হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়, জেরুজালেম —অর্থনীতি  ও ইতিহাসে স্নাতক 

 • ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় —অর্থনীতিতে  পিএইচডি) 


বর্তমানে কর্মক্ষেত্র:

 • যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ওয়েস্টার্ন  ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি ও ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক 

 • এছাড়া তিনি ইসরাইলের তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ ইকোনমিক্স এ  কর্মরত আছেন। 



অবদান ও নোবেল প্রাপ্তি


মকিরকে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে অর্ধেক অংশ — কারণ তিনি নির্ধারণ করেছেন দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক বৃদ্ধির জন্য কোন শর্তগুলি অপরিহার্য — বিশেষ করে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের ভূমিকা নিয়ে। 


তাঁর মূল আইডিয়া হলো:


 জ্ঞান ও প্রযুক্তির  মেলবন্ধন 


 শুধু প্রযুক্তি নয়, তার পিছনে বিজ্ঞান ও ব্যাখ্যাগত ভাবনা থাকতে হবে, যেন নতুন প্রযুক্তি কেন কাজ করে তা বোঝা যায়। 



মেকানিক্যাল পারদর্শিতা


   নতুন প্রযুক্তি কার্যকর হবে যদি মানুষ ও প্রতিষ্ঠান সেটি ব্যবহার করতে পারে ও রপ্ত করতে পারে। 



 অবাধে পরিবর্তনকে গ্রহণ করার সাংগঠনিক ব্যবস্থা 


 নতুন ধারণা ও বদলকে অনুমোদন করতে হবে; যদি প্রতিরোধ থাকে, উদ্ভাবন গতি হারাবে। 




এই ধারণাগুলো একসঙ্গে মিলে একটি দীর্ঘমেয়াদী গতি তৈরি করে — যেখানে নতুন প্রযুক্তি পুরনোগুলিকে প্রতিস্থাপন করে, যাকে বলা হয় ” সৃজনশীল ধ্বংস" — মকিরের ভিত্তি ও Aghion–Howitt মডেল একত্রিত হয়ে একটি সমৃদ্ধ বুনিয়াদ গড়ে তোলে। 



ফিলিপ আগিওঁ







জন্ম: 

১৭ আগস্ট ১৯৫৬, প্যারিস, ফ্রান্স 


শিক্ষা:

 গণিত ও  অর্থনীতিতে  পিএইচডি, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় 


কর্মক্ষেত্র:

 • Collège de France, INSEAD, এবং London School of Economics এ অধ্যাপক 


অবদান ও কাজ:

পিটার হাউইট ও ফিলিপ আগিওঁ একসাথে ১৯৯২ সালে একটি গাণিতিক মডেল প্রণয়ন করেছিলেন, যা দেখায় — নতুন উদ্ভাবন পুরনো পণ্য ও প্রযুক্তি ধ্বংস করে, ফলে বাজারে নতুন গতি আসে। 

 • এই মডেল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে কেবল বিনিয়োগ ও মূলধনের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে ছেঁড়ে এনে — উদ্ভাবন ও প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। 



পিটার হাউইট 





জন্ম:

 ৩১ মে ১৯৪৬, গুয়েলফ, অন্টারিও, কানাডা 


শিক্ষা:


  পিএইচডি, নর্থ ওয়েস্টার্ন  ইউনিভার্সিটি 


কর্মব্যবস্থা:

 • Brown University-তে Lyn Crost Professor of Social Sciences 


অবদান ও চিন্তা:

 • Howitt Aghion-এর সঙ্গে যৌথভাবে “creative destruction” মডেল তৈরি করেছেন, যা দেখায় — উদ্ভাবন শুধু নতুন পণ্য তৈরি করে না, পুরনো শিল্পকে প্রতিস্থাপন করে অর্থনৈতিক গঠন পরিবর্তন করে। 

 • এই মডেল প্রতিযোগিতার ভূমিকা, স্টার্টআপ ও বাজারের পরিবর্তনশীলতা নিয়ে নীতি নির্ধারণে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এনে দিয়েছে। 



ফিলিপ আগিওঁ ও পিটার হাউইট, এই দুই জনকে নোবেল শেয়ার দেওয়া হয়েছে, কারণ তারা প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও উদ্ভাবনকে অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ গতি হিসেবে গড়ে তুলেছেন — অর্থাৎ, সৃষ্টি ও ধ্বংসের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি রূপান্তরিত হয়। 




 কেন এরা নোবেল পেল — একটি সহজ ব্যাখ্যা


আপনার প্রশ্ন — “কেন তারা নোবেল পেল?” — তার উত্তর হলো:


মকির বুঝিয়ে দিয়েছেন, শুধু প্রযুOutreবন বা যান্ত্রিক রহস্য নয় — কল্যাণকর বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন এমন একটি সাংস্কৃতিক, বৈজ্ঞানিক ও সামাজিক পরিবেশ যেখানে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও বদল একসাথে বিকাশ পায়। 


Aghion ও Howitt দেখিয়েছেন, শুধু নতুন পণ্য বা যন্ত্র বানানো নয় — যখন নতুন উদ্ভাবন পুরনোগুলিকে প্রতিস্থাপন করে, অর্থনীতি নিজেই নিজেকে রূপান্তরিত করে। এই ধ্বংসের মাঝেই সৃষ্টি — creative destruction — ঘটিতে পারে। 


তাদের মডেলের সৌন্দর্য হলো — এটি শুধু যে উদ্ভাবনকে উৎসাহ দেয়, সেই সঙ্গে বলে দেয়, কীভাবে নতুন ও পুরনো খাতের বিরোধ সামলাতে হবে, কীভাবে মানুষ ও প্রতিষ্ঠানকে অভিযোজিত করতে হবে, কী নীতি হওয়া উচিত যাতে উদ্ভাবন ও সামাজিক ন্যায্যতা একসাথে চলতে পারে। 



এই কারণেই কমিটি জানিয়েছে — তারা “explained innovation-driven growth” — অর্থাৎ উদ্ভাবনের গতি কেমনভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চালায় তা ব্যাখ্যা করেছেন। 





 তাদের জ্ঞানের প্রভাব: অর্থনৈতিক পরিসর ও মানবকল্যাণে


এখন প্রশ্ন — এই তত্ত্বগুলি বাস্তবে কীভাবে কাজে আসবে? অর্থাৎ, আমাদের সমাজ অর্থনীতি ও মানুষের জীবনে তার প্রভাব কেমন হবে?


বৃদ্ধি ও সমৃদ্ধি


– যখন উদ্ভাবন নতুন প্রযুক্তি চালায়, উৎপাদন দক্ষতা বাড়ে, পণ্য ও পরিষেবার খরচ হ্রাস পায়। ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে, জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়।

– নতুন প্রযুক্তি যেমন জ্বালানাশক্তি, কৃষি, চিকিৎসা, শিক্ষা ক্ষেত্রে আসে — মানুষ বেশি খাওয়া পান করবে, দীর্ঘজীবী হবে, শিক্ষা দেবে — এই মূল্যবোধ বৃদ্ধি পাবে।


কর্মসংস্থান এবং দক্ষতা


– যদিও কিছু পুরনোকর্ম হ্রাস পাবে, নতুন ক্ষেত্রে ও নতুন পেশায় চাকরির সুযোগ তৈরি হবে। উদাহরণ স্বরূপ — ইলেকট্রিক গাড়ি প্রযুক্তি আসায় পুরনো মেকানিক কাজ কম হবে, কিন্তু নতুন মেশিন নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং কাজ বাড়বে।

– তবে এটি সুষ্ঠু হওয়ার জন্য দরকার দক্ষতা বৃদ্ধির নীতিমালা, পুনর্বাসন নির্দেশ, কোনো অঞ্চলে অসম সুযোগ যেন না থাকে — এ বিষয়গুলো নীতি নির্ধারকদের গুরুত্ব দিতে হবে।


নীতি এবং শাসন ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তি


– সরকারের উচিত এমন নীতি তৈরি করা যা উদ্ভাবনকে উৎসাহ দেয় — যেমন গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) এ বিনিয়োগ, কর প্রণোদনা, শিক্ষার উন্নয়ন, উদ্ভাবক সংস্থা ও স্টার্টআপকে সহায়তা।

– একই সঙ্গে, বিরূপ প্রভাব যেমন প্রযুক্তিগত বঞ্চনা, একটি কোম্পানির অতিরিক্ত আধিপত্য, সামাজিক বৈষম্য— এসবকে মনেই রেখে শোষণ ও বৈষম্য কমিয়ে আনতে হবে।

– উদ্ভাবন যদি মাত্র কিছু ধনী অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে দেশীয় বা গ্রামীণ জনশক্তি পিছিয়ে পড়বে — এ জন্য নীতি ও পুনর্বণ্টনকে বিবেচনায় রাখতে হবে।


দারিদ্র্য ও সমতা


– উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি যদি সবার জন্য পৌঁছানো যায় — যেমন সস্তা জ্বালানী, স্বাস্থ্য প্রযুক্তি, ডিজিটাল শিক্ষা — তা দরিদ্র জনগোষ্ঠীরও জীবনমান উন্নত করবে।

– উদ্ভাবনের ফলস্বরূপ তৈরি নতুন প্রযুক্তি ও সেবা যদি “লোকসান কমানো, স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, যোগাযোগ সহজ করা, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি” হয়ে ওঠে — তাহলে মানুষের মৌলিক চাহিদা সহজে পূরণ হবে।

– কিন্তু সতর্ক থাকতে হবে — প্রযুক্তিগত উন্নয়ন যদি শুধুমাত্র ধনীদের জন্য হয়, বৈষম্য বাড়বে। তাই নীতি ও সামাজিক তত্ত্ব বিবেচনা অপরিহার্য।





উপসংহার: তিন কিংবদন্তি — জ্ঞানের সেতুবন্ধন


২০২৫-এর নোবেল বিজয়ী মকির, আগিওঁ ও হাউইট — তারা শুধু অর্থনীতির নতুন তত্ত্ব গড়ে তুলেছেন — তারা বুঝিয়েছেন মানব সভ্যতার গতি কেমন হবে।

তারা দেখিয়েছেন:


শুধু প্রযুক্তি নয়, জ্ঞান ও ব্যাখ্যার গুণাবলী থাকতে হবে,


নতুন উদ্ভাবন যেন পুরনোকেই ধ্বংস না করে, বরং উন্নত সংস্করণ তৈরি করে,


উদ্ভাবন ও বৃদ্ধি যেন মানুষের জীবনে মূল্য নিয়ে আসে — শুধু মুনাফা নয়, মানবকল্যাণ।



এই তত্ত্বগুলি আমাদের শিখায় — আজকের সিদ্ধান্ত, আজকের নীতি, আজকের উদ্ভাবন — ভবিষ্যতের সমাজকে গড়ে দেয়।

আপনার, আমার, আমাদের দেশের জন্য সব থেকে বড় শিক্ষা — জ্ঞান ও উদ্ভাবনকে সম্মান করুন, সংস্কারকে গ্রহণ করুন, এবং ন্যায্য সুযোগ সৃষ্টি করুন।

Comments

Popular posts from this blog

দ্বিতীয় পর্ব :প্রাথমিক পর্যায়ে চালু হওয়া দেশগুলোতে পি আর পদ্ধতির ধরন

প্রথম পর্ব: পি আর পদ্ধতির ইতিহাস ও গণতান্ত্রিক ধারায় এর প্রতিফলন

তৃতীয় পর্ব : পি আর পদ্ধতির সফলতার গল্প